…রূপ সাগরে আমার মন

ওষ্ঠপুট চেপে ধরে রাখতে হবে, নাক যেন পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, মুখ থাকবে খোলা। না, চুম্বনের দৃশ্য নয়, সাগর তলে পাড়ি দেওয়ার আগে কাঁধ সমান জলে দাঁড়িয়ে রীতিমতো যোগাভ্যাস। জলের মধ্যে ঘাম ঝরানো চল্লিশ মিনিটের প্রশিক্ষণ।

মাথার উপর শিউলির মতো টুপটুপ করে ঝরে পড়ছে বারিধারা, মুখে উঠেছে শ্বাস নেওয়ার নল, পরানো হয়েছে নাক চাপা চশমা, আর কাঁখে-কোমরে বাঁধা হয়েছে একরাশ ওজন-ডুবতে হবে যে। আর ঠিক তারপরেই স্কুব, স্কুব, স্কুব রূপ সাগরে আমার মন।

মাত্র বছর দুয়েক আগে চিত্রগুপ্ত খাতায় আমার নাম লিখেও কেটে দিয়েছিলেন বোধহয় এই কারণেই। নাহলে যে সমুদ্রযাত্রা হয়ে উঠত না, একথাও জানা যেত না যে তলাতল পাতাল খুঁজে রত্নধন পেতে হলে স্কুবা ডাইভিং ছাড়া উপায় নেই। সাগরের প্রতিটি পরতে কত যে রং লুকিয়ে আছে তা জানতে হলে সাগর জলে ডোবা ছাড়া গতি নেই। প্রবাল, সি-কিউকাম্বার, সি-অ্যানিমোন আর আপাদমস্তক রঙে রাঙানো, নাম না জানা সংখ্যাতীত মৎস্যকূল সিংহ দরজা দরজা খুলে আপনার জন্য সেখানে অপেক্ষা করছে। খুদেরা যখন প্রবালের মধ্যে ফাঁক- ফোঁকর গলে লুকোচুরি খেলছে তখন বাঁদিকে আবার ওপর-নিচে সারবদ্ধ হয়ে চিত্রার্পিতের মত দাঁড়িয়ে আছে রঙিন মাছের সারি। পাশ দিয়ে সরসরিয়ে একটা সাপ গলে গেল না? হ্যাঁ, তাই তো। এই প্রথম মাথায় ঢুকলো কেন স্টিভ আরউইন আমৃত্যু সমুদ্রের প্রেমে পড়েছিলেন। হ্যাভলক দ্বীপে নাহয় সাগর তলায় ঘুরে আসা গেল, নীল দ্বীপে তো তা করিনি তাহলে কীসের প্রেম আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধল এভাবে? শুধু বালুকাবেলায় বসে থাকলেই ততো হবে না, সাগরের নীল যে কীভাবে রং বদলায় তার হাতে-গরম প্রমাণ এখানেই মিলবে।

এই রং বদলানোর খেলা শুরু হয়েছে সেই রস দ্বীপ থেকে যেখানে সাহেব-মেমেরা প্রথম এ দেশে ইউরোপের একখণ্ড বসিয়ে দিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেই এখানে সাহেবরা ঘাঁটি গাড়ে। ইতালি থেকে মার্বেল এনে তৈরি হয় গির্জা, কমিশনারের মহল, রাত্রে বসে খানা-পিনার আসর, ব্যালে নাচ, হরেক কিসিমের আমোদ-আহ্লাদ। সেসব স্থাপত্য এখন ময়না তদন্তের দিন গুনছে। তবে, এখানে দেখা মিলছে অবাধ হরিণ আর ময়ূরের। কাজেই পয়সা উসুলের কোনও অভাব নেই আন্দামানে। কখনও জোয়ারের জল ফুঁসে এসে হোটেলের পাঁচিলে আছড়ে পড়ছে, আর ভাটার টানে ফিরে গিয়ে রেখে যাচ্ছে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি অপূর্ব এক স্থাপত্য-বিশাল আয়তনের আর্চ।

তবু, ওই যে বললাম, রত্নধন পেতে হলে একবার অন্তত সাগরে ডুব দিতেই হবে। যাঁরা শারীরিকভাবে অক্ষম তাঁরা যেতে পারবেন না বলে, তাঁদের জন্য রইল একরাশ বিষণ্ণতা, আর যাঁরা পেরেও গেলেন না, তাঁদের জন্যও রইল একরাশ বিষাদ।

এত বলার পরেও বলি, শুধু  স্কুবা সফর বাতিল হওয়ার কারণে আন্দামান যাত্রা বাতিল করবেন না। ঠকবেন, মস্ত ঠকবেন।

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s